শিরোনামঃ
জ্বালানি নিরাপত্তার রোডম্যাপে বড় প্রকল্প, অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন জমকালো আয়োজনের সন্ত্রাসবাদ ও সিন্ধু পানি চুক্তিকে আলাদা করে দেখছে না ভারত ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তের দাবি জোরালো গরুর রাখাল থেকে ব্যাংক দখলের দৌড়ে, ফের আলোচনায় লোকিত উল্লাহ নদী ভাঙনকবলিত অসহায়দের পাশে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন স্বাভাবিক ব্যাংকিংয়ে ফেরার পথে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক মেঘনা নদীর ২৪১ একর জমি দখলের অভিযোগ, তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য ৫০% পেনশন সমর্পণকারী কল্যাণ সমিতির অভিষেক ও মতবিনিময় সভা বসুন্ধরায় ছিনতাইয়ের ৩৬ ঘণ্টায় প্রধান অভিযুক্ত আটক

জ্বালানি নিরাপত্তার রোডম্যাপে বড় প্রকল্প, অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন

#
news image

বিদ্যুৎ-গ্যাস খাত সংস্কারে নেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, আমদানি ও নতুন বড় প্রকল্পেই বেশি ঝোঁক বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বিপিডিবি। উৎপাদন, ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্থার আর্থিক চাপ দীর্ঘদিনের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাঁচ বছরের জন্য বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করে বাড়ানো হবে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা। নির্মাণ করা হবে গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। নেয়া হবে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোডম্যাপে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। 

তবে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে করা হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা কী, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই। বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার বিষয়টি সামনে রেখে জ্বালানি নিরাপত্তার নামে নতুন অবকাঠামো ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেই সরকারের ঝোঁক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা।

কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের বিবেচনায় এসব নতুন বড় প্রকল্প ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের সমাধান শুধু নতুন প্রকল্প নির্মাণে নয়। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেখানে সংস্কার করাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত।

দেশের গ্যাস চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরো বাড়বে। একইভাবে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিদেশী প্রযুক্তি, অর্থায়ন, সরঞ্জাম ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা থাকবে। আর এ ধরনের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আন্তর্জাতিক বাজার। বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর জ্বালানি সংকটই এর বাস্তব উদাহরণ। গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গত কয়েক বছরে সরকারকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করা প্রয়োজন ছিল। অথচ নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সে নির্ভরতা আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দক্ষতা উন্নয়ন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দেয়া উচিত। এসব সংস্কার ছাড়া শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় ও আর্থিক ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে নিজস্ব গ্যাস। কিন্তু স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে নেয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল নির্মাণের আগে দেশে কোথায় কী পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে, কত দ্রুত তা অনুসন্ধান করা সম্ভব এবং বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।

দেশে প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা ৬ শতাংশ হারে বাড়বে। ১৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন হিসাব করলে আগামী পাঁচ বছরে চাহিদা দাঁড়াবে ২৫ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াটে। এ সক্ষমতা ব্যবহারের পরও অতিরিক্ত সক্ষমতা বসে থাকবে বিদ্যুৎ খাতে। এর পরও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের রোডম্যাপেই বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সক্ষমতার জন্য পরিশোধ করতে হচ্ছে অর্থ। এতে বিদ্যুৎ খাতের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ।

এ পরিস্থিতিতে আরো নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আগে বিদ্যমান অতিরিক্ত সক্ষমতা কীভাবে কমানো হবে, কোন কেন্দ্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো বন্ধ বা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা পুরনো সমস্যার সমাধান না করেই নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ভবিষ্যতে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরো বেড়ে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ এবং কম খরচের জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত না করলে এ ব্যয় কমানো কঠিন হবে। তাই নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি অতিরিক্ত সক্ষমতার বোঝা কীভাবে কমানো হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে হলে প্রথমেই একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সংস্কার দরকার। অতীতে আমরা বারবার এ কথা বলেছি। কিন্তু সে সংস্কার এখনো হচ্ছে না। এখানে সংস্কার শুধু প্রয়োজনীয়—এমন নয়; আমি মনে করি, সংস্কার এখন একেবারেই জরুরি। বিশেষ করে আমরা যে সংকটের মধ্যে আছি, সে পরিস্থিতিতে সংস্কার শুরু করা দরকার। এ রোডম্যাপ (স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক) হয়তো ভালো সময়ের জন্য করা হয়েছে। কারণ এখানে জরুরি ভিত্তিতে কীভাবে সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা যায়, সেটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এ মুহূর্তে সংস্কারকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একদিকে আমাদের তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্যদিকে একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও করতে হবে।’
বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আর্থিক দুর্বলতা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বছরের পর বছর সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়তে থাকায় সংস্থাটির আর্থিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকারকে নিয়মিত বড় অংকের অর্থ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিপিডিবিও সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অন্যান্য পক্ষের বিল পরিশোধ করছে। এ অবস্থায় শুধু নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিদ্যুৎ চাহিদা সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ সক্ষমতা বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এ অর্থ প্রতিবছর ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদ্যুতে ৫২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে।

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী। বাপেক্সের সাবেক এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ব্যয় বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় নেয়া হয়নি। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়, তা নিশ্চিত করা। এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে ব্যয় আরো বাড়বে এবং সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নও জটিল হয়ে উঠবে।’

নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে সরকারের সাবেক এ আমলা বলেন, ‘দেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও সেটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পে ঋণ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে নতুন করে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক সক্ষমতা সরকারের রয়েছে কিনা, সেটিও আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের রোডম্যাপে খুলনা ও বরিশালে আরো দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এসব অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বিদ্যমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং এলএনজি আমদানির অর্থ জোগান দিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে পেট্রোবাংলা। এ অবস্থায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও আমদানি বাড়লে ভবিষ্যতের আর্থিক দায় কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি আমদানিতে দেশের ব্যয় এরই মধ্যে বছরে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ আরো বাড়লে এ ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিতে সরকারের ভর্তুকিও গত বছরের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি বাবদ আরো প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তাই বিপুল এ আমদানি ব্যয় এবং এলএনজি অবকাঠামোর উচ্চ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই নতুন টার্মিনালের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ জ্বালানি খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের।

দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। অন্যদিকে দ্বীপ জেলার এ গ্যাস ব্যবহার করতে সেখানে নতুন করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো যেত, আবার ভোলার গ্যাসও দেশের বৃহত্তর জ্বালানি ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হতো।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বিপিডিবি। উৎপাদন, ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এ সংস্থার আর্থিক চাপ দীর্ঘদিনের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বছরের পর বছর।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিপিডিবির ব্যয় কাঠামো, জনবলের দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, এটি ইতিবাচক। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বড় আকারে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করবে তাদের দক্ষতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পুরনো ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত জনবল রয়েছে। বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কারণ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরো বড় আকারে কার্যক্রম শুরু হবে, তখন পুরনো এসব লোকবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না। এতে কার্যক্রম ব্যাহত হবে।’

দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এরই মধ্যে সারভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা, নেট মিটারিং সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকের বিদ্যুৎ ক্রয়ের মতো পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য সরকারে নীতি ও করহারে বড় সুবিধা দিয়েছে। তবে সরকারের নেয়া এসব পদক্ষেপের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি, সক্ষমতা বৃদ্ধি নতুন করে জ্বালানি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি হুমকি হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকেই।

জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে আরো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ টেকসই পরিকল্পনা নয়। অতীতে নির্মিত এসব অবকাঠামোর ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার চাপই এখন বহন করতে হচ্ছে। অর্থ ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যমান সক্ষমতারও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হলে তা লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে গতি নেই।’

হাসান মেহেদীর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এজন্য জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।

দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে রাশিয়ার অর্থায়নে। ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ কেন্দ্রটি এখনো উৎপাদনে আনা যায়নি। শুরুতে ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও সময়সীমা বাড়িয়ে চলতি বছরেও দফায় দফায় কেন্দ্রটির উৎপাদন পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনকি চলতি বছরে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এ কেন্দ্র পরিচালনা, কেন্দ্রটি উৎপাদনে জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, এমনকি বিপুল এ ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা যাবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এমন পরিস্থিতির ভেতরে সরকারের নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অপরিকল্পিত চিন্তা বলে মনে করেন সরকারের সাবেক কর্মকর্তারাও।

সরকারের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি অগ্রাধিকার নির্ধারণের রূপরেখা বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাই এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এটা যে এ কৌশলপত্রে বলতে হবে এমনটিও মনে করেন না তারা।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, ‘স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমরা কিছু বলিনি। এ ফ্রেমওয়ার্কে মূলত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি একটি গাইডলাইন। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এসব কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলাদা খাতভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো আরো বিস্তারিতভাবে সামনে আসতে পারে। তখন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কোন ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। আবার শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ বা সংস্কার করলেই যে দেশের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, বিষয়টি এমনও নয়। কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, দক্ষতা, সমন্বয় এবং সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

জ্বালানি সংকট সমাধানের পরিকল্পনার বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করার প্রয়োজন হলে সেটাও করতে হবে।’

অনলাইন ডেস্ক

৫-৯-২০২৬ বিকাল ৬:৩০

news image

বিদ্যুৎ-গ্যাস খাত সংস্কারে নেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, আমদানি ও নতুন বড় প্রকল্পেই বেশি ঝোঁক বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বিপিডিবি। উৎপাদন, ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্থার আর্থিক চাপ দীর্ঘদিনের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাঁচ বছরের জন্য বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করে বাড়ানো হবে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা। নির্মাণ করা হবে গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। নেয়া হবে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোডম্যাপে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। 

তবে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে করা হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা কী, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই। বরং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার বিষয়টি সামনে রেখে জ্বালানি নিরাপত্তার নামে নতুন অবকাঠামো ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেই সরকারের ঝোঁক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা।

কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের বিবেচনায় এসব নতুন বড় প্রকল্প ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের সমাধান শুধু নতুন প্রকল্প নির্মাণে নয়। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেখানে সংস্কার করাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত।

দেশের গ্যাস চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরো বাড়বে। একইভাবে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিদেশী প্রযুক্তি, অর্থায়ন, সরঞ্জাম ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা থাকবে। আর এ ধরনের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আন্তর্জাতিক বাজার। বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর জ্বালানি সংকটই এর বাস্তব উদাহরণ। গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গত কয়েক বছরে সরকারকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করা প্রয়োজন ছিল। অথচ নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সে নির্ভরতা আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দক্ষতা উন্নয়ন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দেয়া উচিত। এসব সংস্কার ছাড়া শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় ও আর্থিক ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে নিজস্ব গ্যাস। কিন্তু স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে নেয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল নির্মাণের আগে দেশে কোথায় কী পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে, কত দ্রুত তা অনুসন্ধান করা সম্ভব এবং বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।

দেশে প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা ৬ শতাংশ হারে বাড়বে। ১৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন হিসাব করলে আগামী পাঁচ বছরে চাহিদা দাঁড়াবে ২৫ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াটে। এ সক্ষমতা ব্যবহারের পরও অতিরিক্ত সক্ষমতা বসে থাকবে বিদ্যুৎ খাতে। এর পরও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের রোডম্যাপেই বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সক্ষমতার জন্য পরিশোধ করতে হচ্ছে অর্থ। এতে বিদ্যুৎ খাতের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ।

এ পরিস্থিতিতে আরো নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আগে বিদ্যমান অতিরিক্ত সক্ষমতা কীভাবে কমানো হবে, কোন কেন্দ্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো বন্ধ বা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা পুরনো সমস্যার সমাধান না করেই নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ভবিষ্যতে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরো বেড়ে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ এবং কম খরচের জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত না করলে এ ব্যয় কমানো কঠিন হবে। তাই নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি অতিরিক্ত সক্ষমতার বোঝা কীভাবে কমানো হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে হলে প্রথমেই একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সংস্কার দরকার। অতীতে আমরা বারবার এ কথা বলেছি। কিন্তু সে সংস্কার এখনো হচ্ছে না। এখানে সংস্কার শুধু প্রয়োজনীয়—এমন নয়; আমি মনে করি, সংস্কার এখন একেবারেই জরুরি। বিশেষ করে আমরা যে সংকটের মধ্যে আছি, সে পরিস্থিতিতে সংস্কার শুরু করা দরকার। এ রোডম্যাপ (স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক) হয়তো ভালো সময়ের জন্য করা হয়েছে। কারণ এখানে জরুরি ভিত্তিতে কীভাবে সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা যায়, সেটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এ মুহূর্তে সংস্কারকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একদিকে আমাদের তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, অন্যদিকে একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও করতে হবে।’
বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আর্থিক দুর্বলতা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বছরের পর বছর সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়তে থাকায় সংস্থাটির আর্থিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকারকে নিয়মিত বড় অংকের অর্থ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিপিডিবিও সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অন্যান্য পক্ষের বিল পরিশোধ করছে। এ অবস্থায় শুধু নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিদ্যুৎ চাহিদা সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ সক্ষমতা বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এ অর্থ প্রতিবছর ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদ্যুতে ৫২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে।

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী। বাপেক্সের সাবেক এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ব্যয় বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় নেয়া হয়নি। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়, তা নিশ্চিত করা। এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে ব্যয় আরো বাড়বে এবং সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নও জটিল হয়ে উঠবে।’

নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে সরকারের সাবেক এ আমলা বলেন, ‘দেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও সেটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পে ঋণ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে নতুন করে আরো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক সক্ষমতা সরকারের রয়েছে কিনা, সেটিও আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের রোডম্যাপে খুলনা ও বরিশালে আরো দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এসব অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ বিদ্যমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং এলএনজি আমদানির অর্থ জোগান দিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে পেট্রোবাংলা। এ অবস্থায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও আমদানি বাড়লে ভবিষ্যতের আর্থিক দায় কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি আমদানিতে দেশের ব্যয় এরই মধ্যে বছরে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ আরো বাড়লে এ ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিতে সরকারের ভর্তুকিও গত বছরের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি বাবদ আরো প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তাই বিপুল এ আমদানি ব্যয় এবং এলএনজি অবকাঠামোর উচ্চ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই নতুন টার্মিনালের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ জ্বালানি খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের।

দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। অন্যদিকে দ্বীপ জেলার এ গ্যাস ব্যবহার করতে সেখানে নতুন করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো যেত, আবার ভোলার গ্যাসও দেশের বৃহত্তর জ্বালানি ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হতো।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বিপিডিবি। উৎপাদন, ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এ সংস্থার আর্থিক চাপ দীর্ঘদিনের। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বছরের পর বছর।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিপিডিবির ব্যয় কাঠামো, জনবলের দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, এটি ইতিবাচক। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বড় আকারে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করবে তাদের দক্ষতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পুরনো ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত জনবল রয়েছে। বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কারণ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরো বড় আকারে কার্যক্রম শুরু হবে, তখন পুরনো এসব লোকবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না। এতে কার্যক্রম ব্যাহত হবে।’

দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এরই মধ্যে সারভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা, নেট মিটারিং সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকের বিদ্যুৎ ক্রয়ের মতো পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য সরকারে নীতি ও করহারে বড় সুবিধা দিয়েছে। তবে সরকারের নেয়া এসব পদক্ষেপের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি, সক্ষমতা বৃদ্ধি নতুন করে জ্বালানি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি হুমকি হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকেই।

জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে আরো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ টেকসই পরিকল্পনা নয়। অতীতে নির্মিত এসব অবকাঠামোর ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার চাপই এখন বহন করতে হচ্ছে। অর্থ ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যমান সক্ষমতারও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হলে তা লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে গতি নেই।’

হাসান মেহেদীর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এজন্য জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।

দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে রাশিয়ার অর্থায়নে। ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ কেন্দ্রটি এখনো উৎপাদনে আনা যায়নি। শুরুতে ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও সময়সীমা বাড়িয়ে চলতি বছরেও দফায় দফায় কেন্দ্রটির উৎপাদন পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনকি চলতি বছরে কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এ কেন্দ্র পরিচালনা, কেন্দ্রটি উৎপাদনে জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, এমনকি বিপুল এ ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা যাবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। এমন পরিস্থিতির ভেতরে সরকারের নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অপরিকল্পিত চিন্তা বলে মনে করেন সরকারের সাবেক কর্মকর্তারাও।

সরকারের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি অগ্রাধিকার নির্ধারণের রূপরেখা বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাই এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এটা যে এ কৌশলপত্রে বলতে হবে এমনটিও মনে করেন না তারা।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, ‘স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে আমরা কিছু বলিনি। এ ফ্রেমওয়ার্কে মূলত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি একটি গাইডলাইন। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এসব কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলাদা খাতভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো আরো বিস্তারিতভাবে সামনে আসতে পারে। তখন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কোন ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। আবার শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ বা সংস্কার করলেই যে দেশের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, বিষয়টি এমনও নয়। কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, দক্ষতা, সমন্বয় এবং সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

জ্বালানি সংকট সমাধানের পরিকল্পনার বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করার প্রয়োজন হলে সেটাও করতে হবে।’